প্রশ্ন : হজ সম্পন্ন করার পরে কেউ যদি তায়েফে ঘুরতে যায়, তবে মক্কায় ফিরে আসার সময় কি আবার ইহরাম বেঁধে আসতে হবে? এ ব্যাপারে কী বিধান? জানালে উপকৃত হব।
উত্তর : মিকাত অতিক্রম করে মক্কায় প্রবেশের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো— যে ব্যক্তি হজ বা উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশ করতে চায়, তার জন্য মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা আবশ্যক। ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করা তার জন্য জায়েয নয়। এ ব্যাপারে সকল ইমাম একমত।
তবে যদি কেউ হজ বা উমরা ছাড়া অন্য কোনো প্রয়োজনে মক্কায় প্রবেশ করতে চায় এবং উক্ত প্রয়োজনে তাকে বারবার মক্কায় যাতায়াত করতে হয়, যেমন ট্যাক্সিচালক, ডেলিভারি বয়, ডাকপিয়ন ইত্যাদি, তবে তাদের জন্য ইহরাম ছাড়া মক্কায় প্রবেশ করা জায়েয। এ বিষয়েও চার মাযহাবের ফকিহগণ একমত।
কিন্তু কেউ যদি এমন উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশ করতে চায়, যার জন্য বারবার যাতায়াতের প্রয়োজন হয় না, যেমন ভ্রমণ, আত্মীয়-স্বজনের সাক্ষাৎ, ব্যক্তিগত কাজ ইত্যাদি, তবে মিকাত অতিক্রম করতে তার জন্য ইহরাম বাঁধা আবশ্যক হবে কিনা— তা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে।
ইবনে হাযম যাহেরি রহ.-সহ কিছু শাফেয়ি ও হাম্বলি আলেমের মত হলো, এ ক্ষেত্রে ইহরাম বাঁধা আবশ্যক নয়। ইমাম শাফেয়ি রহ. থেকেও অনুরূপ একটি বর্ণনা পাওয়া যায়।
অপরদিকে ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ রহ.-সহ উম্মাহর অধিকাংশ ফকিহর মত হলো, এমন ব্যক্তির মক্কায় প্রবেশ করার জন্য হজ বা উমরার ইহরাম বাঁধা আবশ্যক। ইমাম শাফেয়ি রহ. থেকেও অনুরূপ মত পাওয়া যায়।
এ মতটি সাহাবিদের ফতোয়া দ্বারা সমর্থিত। মুহাম্মাদ ইবনে আলি রহ. থেকে বর্ণিত, আলি ইবনে আবু তালেব রা. বলেন,
لا يدخل الحرم إلا محرم
অর্থ : মুহরিম ছাড়া হারামে কেউ প্রবেশ করবে না। [কিতাবুল হুজ্জাহ, ২/৪২৭]
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
لَا يَدْخُلُ أَحَدٌ مَكَّةَ إِلَّا مُحْرِمًا
অর্থ : ইহরাম ছাড়া কেউ মক্কায় প্রবেশ করবে না। [শারহু মাআনিল আসার, ৪১৭২]
আরেক বর্ণনায় এসেছে যে, কেউ ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করলে ইবনে আব্বাস রা. তাকে ইহরাম বেঁধে আসার জন্য ফেরত পাঠাতেন। [মারিফঅতুস সুনান ওয়াল আসার, ৯৪৩২]
এ ব্যাপারে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান শাইবানি রহ. বলেন,
لَيْسَ يَنْبَغِي ان يُجَاوز وقتا من الْمَوَاقِيت الى مَكَّة بِغَيْر احرام
অর্থ : মক্কায় যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে ইহরাম ছাড়া কোনো মিকাত অতিক্রম করা উচিত (বৈধ) নয়। [কিতাবুল হুজ্জাহ, ২/৪২৯]
প্রখ্যাত মালেকি ফকিহ ইমাম সাকালি রহ. বলেন,
كل من دخل مكة من غير مكثري التردد فإنه يحرم عليه دخولها حلالاً، وإن لم يرد نسكاً
অর্থাৎ, যাদের বারবার মক্কায় আসার প্রয়োজন পড়ে না, তাদের জন্য ইহরামবিহীন মক্কায় প্রবেশ করা হারাম, যদিও হজ বা উমরা করার ইচ্ছা না থাকে। [আল-জামি লি মাসায়িলিল মুদাওয়ানা, ৪/৪৬২]
বিখ্যাত হাম্বলি ফকিহ আল্লামা বুহুতি রহ. বলেন,
ولا يجوز لمن أراد دخولَ مكَّةَ، أو دخول الحَرَم، أو أراد نُسُكًا تجاوزُ الميقات بغير إحرام لأنه صلى الله عليه وسلم وقَّت المواقيت، ولم يُنقل عنه ولا عن أحدٍ من أصحابه أنهم تجاوزوها بغير إحرام.... وظاهر كلامه: أنه إذا أرادها لتجارة أو لزيارة، أنه يلزمه، نصَّ عليه، واختاره الأكثر
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি মক্কা বা হারামের এরিয়ায় প্রবেশ করতে চায় অথবা হজ বা উমরা করার ইচ্ছা করে, তার জন্য ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করা জায়েয নয়। কারণ, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিকাত নির্ধারণ করেছেন, আর নবীজি বা তাঁর কোনো সাহাবি থেকে বর্ণিত নেই যে, তারা ইহরামবিহীন মিকাত অতিক্রম করেছেন। উপরিউক্ত বক্তব্যের বাহ্যিক দাবি হলো, যদি কেউ ব্যবসা বা ভ্রমনের জন্য মক্কায় যেতে চায়, তবে তার জন্যও ইহরাম আবশ্যক। ইমাম আহমাদ রহ. অনুরূপ বলেছেন। আর এটাই অধিকাংশ হাম্বলি ফকিহ গ্রহণ করেছেন। [কাশশাফুল কিনা, ৬/৭৩]
মোটকথা, যাদের বারবার মক্কায় যাতায়াত করার প্রয়োজন পড়ে না, তারা হজ-উমরা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে মক্কায় গেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহর মতানুসারে ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করা জায়েয হবে না, বরং তারা ইহরাম বেঁধে মক্কায় যাবেন, অতঃপর হজ বা উমরা সম্পন্ন করে হালাল হয়ে অন্যান্য কাজ করবেন।
অতএব, কেউ হজ সম্পন্ন করে তায়েফ বা মিকাতের বাইরের অন্য কোনো এলাকায় ঘুরতে গেলে মক্কায় ফেরার সময় মিকাত থেকে উমরার ইহরাম বেঁধে আসতে হবে। ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করা তার জন্য জায়েয হবে না।
যদি কেউ ভুলক্রমে বা না-জেনে ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করেনে, তবে তিনি পুনরায় মিকাতে ফিরে গিয়ে ইহরাম বেঁধে উমরাহ সম্পন্ন করবেন। অথবা তিনি চাইলে মিকাতের ভেতর থেকেও ইহরাম বেঁধে উমরা সম্পন্ন করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ইহরামবিহীন মিকাত অতিক্রম করার কারণে তাকে একটা দম দিতে হবে।
আরও দ্রষ্টব্য, আল-মুসান্নাফ লি ইবনি আবি শাইবা, ১৪০১৯; আল-ইসতিযকার, ৫/১৮০; আল-জামি লি-উলুমিল ইমাম আহমাদ, ৭/৫৯৬; আল-মুহাল্লা, ৫/৩০৪; বাদায়িউস সানায়ি, ২/১৬৬; যাদুল মাআদ, ১/২৬; ফাতহুল কাদির, ২/৪২৬; রাদ্দুল মুহতার, ২/৪৮৭
১২২ টি প্রশ্ন আছে
৬০ টি প্রশ্ন আছে
১২১ টি প্রশ্ন আছে
২১৮ টি প্রশ্ন আছে
২৪ টি প্রশ্ন আছে
৭৯ টি প্রশ্ন আছে
৩৫ টি প্রশ্ন আছে
৫৮ টি প্রশ্ন আছে
৬৫ টি প্রশ্ন আছে
১৪১ টি প্রশ্ন আছে
২২১ টি প্রশ্ন আছে
৮৬ টি প্রশ্ন আছে