প্রশ্ন : হজের সময় ১০ জিলহজ হাজীদের অন্যতম চারটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, জামরায় পাথর নিক্ষেপ করা, কুরবানি করা এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা ও তাওয়াফে যিয়ারাহ করা। হানাফি মাযহাব মতে প্রথম তিনটি কাজের মধ্যে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ওয়াজিব। পূর্বে গ্রুপভিত্তিক কুরবানির সুযোগ থাকায় এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু এ বছর থেকে গ্রুপভিত্তিক কুরবানি করার সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। সৌদি সরকার নিয়ম করেছে যে, কুরবানির অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে সরকারি ফান্ডে জমা দিতে হবে এবং সরকারই হাজীদের পক্ষ থেকে কুরবানি সম্পাদন করবে।
অন্যদিকে সৌদি আরবে হাম্বলি ফিকহ প্রচলিত, যেখানে উপরিউক্ত কাজগুলোর মাঝে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি মনে করা হয় না। কিন্তু হানাফি ফিকহ অনুযায়ী যেহেতু ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আবশ্যক, তাই হানাফি মাযহাবের অনুসারীদের জন্য এটি একটি বাস্তব সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, একদিকে গ্রুপভিত্তিক বা ব্যক্তিগত কুরবানি অনুমোদিত নয়; অন্যদিকে ব্যক্তিগতভাবে কুরবানি করা অনেকের জন্য কঠিন, বরং কখনো কখনো অসম্ভবপ্রায়। তদুপরি ব্যক্তিগতভাবে কুরবানি করতে গেলে দ্বিগুণ ব্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়। কারণ সরকার পূর্বেই নির্ধারিত অর্থ গ্রহণ করছে, আবার ব্যক্তিগত কুরবানির জন্য নতুন করে ব্যয় করতে হবে। আর যেহেতু আইয়ামে তাশরিকের শেষ দিন পর্যন্ত কুরবানি করার সুযোগ থাকে, তাই সরকারিভাবে কুরবানি সেদিন পর্যন্ত চলতে থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য আইয়ামে তাশরিকের শেষ পর্যন্ত ইহরামরত অবস্থায় থাকাও কষ্টকর। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের হাজীগণের করণীয় কী?
উত্তর : বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
১০ জিলহজ তামাত্তু ও কিরান হজ পালনকারীদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ হলো, যথাক্রমে জামারায় পাথর নিক্ষেপ করা, কুরবানি করা এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা।
এ কাজগুলো উল্লিখিত ধারবাহিকতায় করা কাম্য এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ। এ ব্যাপারে ফকিহগণের মাঝে কোনো মতভেদ নেই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত কাজগুলো উল্লিখিত ধারাবাহিকতায়ই সম্পাদন করেছেন। আনাস ইবনে মালেক রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হজের কার্যক্রমের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,
إنّ رسول الله صلى الله عليه وسلم أَتَى مِنًى فَأَتَى الْجَمْرَةَ فَرَمَاهَا. ثُمَّ أَتَى مَنْزِلَهُ بِمِنًى وَنَحَرَ. ثُمَّ قَالَ لِلْحَلَّاقِ "خُذْ
অর্থাৎ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিনায় এলেন। এরপর জামরায় গিয়ে পাথর মারলেন। অতঃপর মিনার অবস্থানস্থলে এসে পশু জবাই করলেন। এরপর মুণ্ডনকারীকে বললেন, এবার মাথার চুল মুণ্ডন করো। [সহিহ মুসলিম, ১৩০৫]
ইমাম ইবনুর রুশদ রহ. ‘বিদায়াতুল মুজতাহিদ’ গ্রন্থে বলেন,
وثبت أن رسول الله صلى الله عليه وسلم رمى في حجته الجمرة يوم النحر، ثم نحر بدنه، ثم حلق رأسه، ثم طاف طواف الإفاضة . وأجمع العلماء على أن هذا سنة الحج
এ কথা প্রমাণিত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১০ জিলহজ্ব প্রথমে পাথর নিক্ষেপ করেছেন, এরপর পশু জবাই করেছেন, এরপর মাথা মুণ্ডন করেছেন। এরপর তাওয়াফে যিয়ারত করেছেন। আর সকল আলেম এ ব্যাপারে একমত যে, এটাই হজের সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। [বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ২/১১৭]
মোটকথা, এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কাম্য ও কাঙ্ক্ষিত হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতপার্থক্য নেই। তবে এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করার ফিকহি অবস্থান কী এবং এর ব্যত্যয় ঘটলে দম ওয়াজিব হবে কিনা—এ ব্যাপারে ইমামগণের মতানৈক্য রয়েছে।
ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ.-এর মত হলো, উপরিউক্ত কাজগুলোর মাঝে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সুন্নাহ। বিনা প্রয়োজনে এর লঙ্ঘন করা অনুচিত। তবে উক্ত ধারাবাহিকতার ব্যত্যয় ঘটলে দম ওয়াজিব হবে না। বিস্তারিত বিধিবিধানে তাদের মাঝে কিছুটা মতপার্থক্য থাকলেও দম ওয়াজিব না হওয়ার ব্যাপারে সকলেই একমত।
পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মত হলো, পাথর নিক্ষেপ, কুরবানি ও পশু জবাইয়ের মাঝে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ওয়াজিব। এ ধারাবাহিকতার ব্যত্যয় ঘটলে দম ওয়াজিব হবে। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকেও অনুরূপ ফতোয়া বর্ণিত রয়েছে।
উপরিউক্ত দুই ধরনের মতামতের পক্ষেই গ্রহণযোগ্য দলিল রয়েছে। তবে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মত অধিক সতর্কতাপূর্ণ হওয়ায় হানাফি ফকিহগণ এ মতের ওপরই ফতোয়া দিয়ে এসেছেন। এ মতানুসারেই হানাফি মাযহাবের অনুসারীদের আমল চলমান ছিল।
তবে বর্তমানে যেহেতু হাজীদের কুরবানি সরকারিভাবে করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, আর এতে উপরিউক্ত ধারাবাহিকতা রক্ষা করার নিশ্চয়তা নেই; এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে আলাদা আলাদা কুরবানি করাও কঠিন, বরং অনেকের জন্য অসম্ভবপ্রায়। অধিকন্তু ব্যক্তিগতভাবে কুরবানি করার জন্য অতিরিক্ত অর্থও খরচ করতে হবে, যা অনেক হাজীর পক্ষে কঠিন হতে পারে।
এজন্য যদি হাজীগণ ১০ জিলহজ জামারায় পাথর নিক্ষেপ সম্পন্ন করে পশু যবাইয়ের জন্য উল্লেখযোগ্য সময় অপেক্ষা করার পর মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করে ফেলেন, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ইমামগণের মত অনুসরণপূর্বক তার এ কাজকে ত্রুটিমুক্ত গণ্য করা হবে এবং ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে না পারায় তার ওপর দম বা অন্য কোনো জরিমানা আরোপিত হবে না।
পাকভারত উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় দ্বীনি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান জামিয়া দারুল উলুম করাচী, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানুরি টাউন, জামিয়াতুর রশীদ প্রভৃতির দারুল ইফতা থেকেও অনুরূপ ফতোয়া দেওয়া হয়েছে।
আরও দ্রষ্টব্য, আল-মুগনি, ৫/৩২০; আল-বাহরুর রায়িক, ৩/২৬; দুরারুল হুক্কাম শারহু গুরারিল আহকাম, ১/২৪৩
১২২ টি প্রশ্ন আছে
৬০ টি প্রশ্ন আছে
১২১ টি প্রশ্ন আছে
২১৮ টি প্রশ্ন আছে
২৪ টি প্রশ্ন আছে
৭৯ টি প্রশ্ন আছে
৩৪ টি প্রশ্ন আছে
৫৮ টি প্রশ্ন আছে
৬৫ টি প্রশ্ন আছে
১৪১ টি প্রশ্ন আছে
২২১ টি প্রশ্ন আছে
৮৬ টি প্রশ্ন আছে