প্রশ্ন : আমার কোনো সন্তান নেই। এক ছেলেকে দত্তক নিয়ে ছোটবেলা থেকে আমরা লালনপালন করেছি। এখন সে আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। এজন্য আমি চাই, আমার জীবদ্দশায়ই আমার সকল সম্পত্তি এতিমখানায় দান করে দেব। শরিয়তের দৃষ্টিতে ওই পালক সন্তান কি আমার উত্তরাধিকার হবে? আর তাকে সম্পত্তি না দিলে কি আমি গুনাহগার হব?
উত্তর : বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
এক. পালক সন্তান ঔরসজাত সন্তানের মতো নয়। এজন্য পালক সন্তানের ক্ষেত্রে ঔরসজাত সন্তানের বিধান প্রযোজ্য হয় না এবং সে পালনকারী বাবার উত্তরাধিকারের অংশও পায় না।
ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবের লোকজন পালক সন্তানকে বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে ঔরসজাত সন্তানের মতো মনে করত, এমনকি তাদেরকে উত্তরাধিকারের অংশীদারও বানাতো। মহান আল্লাহ তাদের এ অবান্তর ধারণা ও প্রথাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন,
وَمَا جَعَلَ أَدۡعِیَاۤءَكُمۡ أَبۡنَاۤءَكُمۡۚ ذَ ٰلِكُمۡ قَوۡلُكُم بِأَفۡوَ هِكُمۡ
অর্থ : আর তিনি তোমাদের মুখে ডাকা পুত্রদেরকে তোমাদের প্রকৃত পুত্র সাব্যস্ত করেননি। এটা তো তোমাদের মুখের কথামাত্র। [সুরা আহযাফ, ৪]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা শাওকানি রহ. বলেন,
ليس ذلك إلا مجرد قول بالأفواه، ولا تأثير له، فلا تصير المرأة به أما، ولا ابن الغير به ابنا، ولا يترتب على ذلك شيء من أحكام الأمومة والبنوة.
অর্থাৎ, পালক পুত্রকে পুত্র বলা শুধুই মুখের কথা। বাস্তবে এর কোনো কার্যকারিতা নেই। এর ফলে মহিলা ওই সন্তানের মা সাব্যস্ত হবে না এবং ওই ছেলেও এর ফলে বাস্তবিক পুত্র সাব্যস্ত হবে না। আর এরূপ ক্ষেত্রে মা ও ছেলের কোনো বিধানও প্রযোজ্য হবে না। [আল-ফাতহুল কাদির, ৪/৩০১]
আল্লামা যফর আহমাদ উসমানি রহ. বলেন,
إن الدعى والمتبنى لا يلحق فى الأحكام بالابن فلا يستحق الميراث.
অর্থাৎ, মুখে ডাকা বা দত্তক নেওয়া সন্তান বিধানের ক্ষেত্রে ঔরসজাত পুত্রের মতো নয়। সুতরাং সে উত্তরাধিকারের হকদার হবে না। [আহকামুল কুরআন, ৩/২৯১]
তবে উত্তরাধিকারের হকদার না হলেও এরূপ সন্তানের জন্য ওসিয়ত করা জায়েয।
দুই. জীবদ্দশায় নিজের সকল সম্পদ দান করে দেওয়া মৌলিকভাবে জায়েয। বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হাদিসে এসেছে যে, আবু বকর সিদ্দিক রা. নিজের সকল সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিয়েছেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা গ্রহণ করেছেন। [দ্রষ্টব্য, সুনানু আবি দাউদ, ১৬৭৮]
এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ব্যক্তি চাইলে নিজের সকল সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেওয়ার অধিকার রাখে।
তবে সকল সম্পদ দান করার পরিবর্তে সম্পদের অংশবিশেষ দান করা উত্তম, যেন ভবিষ্যতে অর্থসংকটে নিজের জীবন ও পরিবারের জীবন বিপন্ন না হয় এবং ওয়ারিশদেরকে মানুষের কাছে হাত পাতার প্রয়োজন না পড়ে। সাহাবি কাব ইবনে মালেক রা.-এর ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি তাবুক যুদ্ধের পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলেন, আমি তাওবার অংশ হিসেবে আমার সকল সম্পদ দান করে দিতে চাই। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি বলেন,
أَمْسِكْ عَلَيْكَ بَعْضَ مَالِكَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ.
অর্থাৎ তুমি কিছু সম্পদ নিজের কাছে রেখে দাও। এটা তোমার জন্য উত্তম হবে। [সহিহ বুখারি, ২৭৫৭]
আরেক হাদিসে এসেছে যে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-কে বলেন,
إِنَّكَ أَنْ تَذَرَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَذَرَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ.
অর্থাৎ, তুমি তোমার ওয়ারিশদেরকে সচ্ছল অবস্থায় ছেড়ে যাওয়া তাদেরকে অভাবগ্রস্থ অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম, যার পরে তাদেরকে মানুষের কাছে হাত পাততে হবে। [সহিহ বুখারি, ১২৯৫]
এ দুটি হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, সকল সম্পদ দান করার চেয়ে কিছু সম্পদ দান করা এবং কিছু সম্পদ নিজের জন্য ও ওয়ারিশদের জন্য রেখে দেওয়া উত্তম।
অতএব, প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার জন্য সকল সম্পদ এতিমখানায় দান করে দেওয়া জায়েয। তবে নিজের জন্য এবং অন্যান্য ওয়ারিশ থাকলে তাদের জন্য কিছু সম্পদ রেখে দেওয়া উত্তম হবে।
আর আপনার ত্যাজ্য সম্পদে পালক সন্তানের কোনো অধিকার নেই। তবে সে অসহায় হয়ে থাকলে সম্পদের কিছু অংশ তার জন্য ওসিয়ত করে যেতে পারেন।
আরও দ্রষ্টব্য, ইহকামুল আহকাম, ২/২৬৮; আল-ইলমাম, ২/১৪৪; ফায়যুল বারি, ৩/১০৫; নাইলুল আওতার, ৮/২৮৮
১২২ টি প্রশ্ন আছে
৬০ টি প্রশ্ন আছে
১২১ টি প্রশ্ন আছে
২১৮ টি প্রশ্ন আছে
২৪ টি প্রশ্ন আছে
৭৯ টি প্রশ্ন আছে
৩৩ টি প্রশ্ন আছে
৫৮ টি প্রশ্ন আছে
৬৫ টি প্রশ্ন আছে
১৪১ টি প্রশ্ন আছে
২২১ টি প্রশ্ন আছে
৮৬ টি প্রশ্ন আছে